আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বরিশাল জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত।
বরিশাল জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত:-
বরিশাল জেলার ১০টি বিখ্যাত বা দর্শনীয় স্থান:
দুর্গাসাগর দিঘী
দুর্গাসাগর হল, বাংলাদেশের দক্ষিণে বরিশাল জেলার অন্তর্গত একটি বৃহৎ দিঘী। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে স্বরূপকাঠি – বরিশাল সড়কে মাধবপাশায় এর অবস্থান। শুধু জলাভূমির আকার ২৭ একর। পার্শবর্তী পাড় ও জমি সহ মোট আয়তন ৪৫.৪২ একর। ১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ন এই বিশাল জলাধারটি খনন করেন। তার স্ত্রী দুর্গামতির নামানুসারে এর নাম করন করা হয় দুর্গাসাগর। ১৯৭৪ সালে তৎকালিন সরকারের উদ্যোগে দিঘীটি পুনরায় সংস্কার করা হয়।
বর্তমানে “দুর্গাসাগর দিঘীর উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারন্য” নামে একটি প্রকল্পের অধিনে বরিশাল জেলা প্রশাসন দিঘীটির তত্ত্বাবধান করছে। সম্পূর্ণ দিঘীটি উঁচু সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেড়া। এই দুই দিকে প্রবেশের জন্য দুইটি গেট আছে। দিঘীর মাঝখানে জঙ্গলপূর্ণ একটি ছোট দ্বীপ আছে। শীতকালে এখানে অতিথি পাখির সমাগম হয়। চৈত্রমাসের অষ্টমী তিথীতে হিন্দু ধর্মালম্বীরা এখানে পবিত্র স্নানের উদ্দেশ্যে সমবেত হন।

গুঠিয়া মসজিদ
বাইতুল আমান জামে মসজিদ (এছাড়াও গুঠিয়া মসজিদ, কমপ্লেক্স নামেও পরিচিত) বাংলাদেশের বরিশাল জেলায় অবস্থিত। এখানে ২০ হাজার অধিক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ঈদগাহ্ ময়দান রয়েছে। চাংগুরিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী এস সরফুদ্দিন আহমেদ এটির নির্মাণ ব্যয় বহন করেন। কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশপথের ডানে বড় পুকুর।
পুকুরের পশ্চিম দিকে মসজিদ অবস্থিত এবং এর মিনারটির উচ্চতা প্রায় ১৯৩ ফুট। এস. সরফুদ্দিন আহম্মেদ গুঠিয়া বাইতুল আমান জামে মসজিদ-এর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করেন (১৬ ডিসেম্বর ২০০৩)। মসজিদটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় (২০০৬)। এবং গুঠিয়ার নামেই ৮ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি পরিচিতি লাভ করে।
বিবির পুকুর
বিবির পুকুর বাংলাদেশের বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি শতবর্ষের পুরানো ও ঐতিহ্যবাহী কৃত্রিম জলাশয়। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরির পালিত সন্তান জিন্নাত বিবির উদ্যোগে জনগণের জলকষ্ট নিরসনের জন্য নগরীর সদর রোডের পূর্ব পাশে ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮৫০ ফুট প্রস্থ একটি পুকুর খনন করা হয়। পরবর্তীতে এটি তার নাম অনুসারে “বিবির পুকুর” নামে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশের অন্য কোন বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে এরকম জলাশয় নেই এবং এটি বরিশাল নগরীর অন্যতম সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য বলে বিবেচিত হয়।
খাবার পানির সংকট নিরসনের জন্য জলাশয় খনন করা হয় ও এ অনুযায়ী নগরীর সদর রোডের পূর্ব পাশে ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮৫০ ফুট প্রস্থ একটি পুকুর খনন করা হয়। তখন থেকেই পুকুরটি বিবির পুকুর নামে পরিচিতি লাভ করে। একসময় কীর্তনখোলা নদীর সাথে এ পুকুরের দুটি সংযোগ ছিল এবং এতে নিয়মিত জোয়ার ভাটা হত। সংযোগ দুটির একটি বরিশাল সার্কিট হাউজ হয়ে মৃতপ্রায় ভাটার খালের মাধ্যমে কীর্তনখোলায় এবং অপরটি নগরীর গির্জা মহল্লার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিলুপ্ত খালের মাধ্যমে কীর্তনখোলা নদীর সাথে যুক্ত ছিল।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগে অবস্থিত অন্যতম একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দেশের ৩৩তম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১১ সালে বরিশালের বিভাগীয় শহরে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বরিশাল বিভাগে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সাধারন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠার সময় ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে মাত্র ছয়টি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি ২৫টি বিভাগে স্নাতক ও ১৮টি বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম প্রদান করছে। প্রতিবছর ছয়টি অনুষদে স্নাতক পর্যায়ে প্রায় ১৪৯০ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। বরিশাল বিশ্ববিদ্যাল শহরাঞ্চলীয় অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমানে একটিই স্থায়ী ক্যাম্পাস রয়েছে। ৫৩ একরের এই ক্যাম্পাস বরিশাল সদর উপজেলার অধীনস্থ কর্ণকাঠিতে কীর্তনখোলা নদীর তীরে শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু সংলগ্ন ঢাকা-পটুয়াখালী মহাসড়কের পাশে অবস্থিত।

মাধবপাশা জমিদার বাড়ি
মাধবপাশা জমিদার বাড়ি বাংলাদেশ এর বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা নামক স্থানে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। যা আগে একটি রাজবংশ ছিলে। পরে রাজবংশ থেকে জমিদারে পরিণত হয়।
এই জমিদার বংশধররা মূলত একটি রাজবংশ ছিল। তাদের ছিল স্বাধীন রাজত্ব। প্রায় ১৪০০ শতক থেকে ১৬০০ শতক পর্যন্ত তারা স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। পরবর্তীতে মুগল শাসনামলে ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে রাজা রামচন্দ্র মুগল বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর এটি রাজশাসন থেকে জমিদারে পরিণত হয়। অর্থাৎ মুগলদের শাসনের আওতাধীন তারা জমিদারী এলাকা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর থেকে এটি রাজপরিবার থেকে জমিদার পরিবারে পরিণত হয়।
সেই মোতাবেক রামচন্দ্রই এই জমিদার বাড়ির প্রথম জমিদার। এরপর কীর্তিনারায়ণ, বাসুদেবনারায়ণ, প্রতাপনারায়ণ, প্রেমনারায়ণ, উদয়নারায়ণের, শিবনারায়ণ, লক্ষ্মীনারায়ণ ও জয়নারায়ণ জমিদার হন। তবে এই বংশের গোড়াপত্তনকারী ছিলেন চন্দ্রদ্বীপ রাজ। তিনি হলেন রাজবংশের গোড়াপত্তনকারী এবং প্রথম রাজা। ব্রিটিশ শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দবস্ত এর সময় জমিদার ছিলেন জয়নারায়ণ। তখন এর রাজস্ব ধরা হয়েছিল ৮৩০০০ সিক্কা।
যা জয়নারায়ণের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব ছিলো না। যার ফলস্বরূপ ১৭৯৯ সালে এই জমিদারী নিলামে উঠে। নিলামের মাধ্যমে এই জমিদারীর অধিকাংশ ক্রয় করেন সিংহ, জর্জ প্যানিয়াটি এবং মানিকমুদি নামে তিনজন। পরে জমিদারীর কিছু অংশ বাকী থাকে। আর এইভাবে বড় একটি রাজপরিবার থেকে জমিদার। আবার জমিদার থেকে একদম নিঃস্ব হয়ে যায় জমিদার বংশধররা। অবশেষে ১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তীর আইনের মধ্য দিয়েই এই জমিদার বাড়ির জমিদারীর অবসান ঘটে।
